কক্সবাজারের প্রাচীন ঐতিহ্য ও আকর্ষণীয় স্থাপনা
আজগবি মসজিদ
কক্সবাজারের ইতিহাস ও স্থাপত্যের অন্যতম দৃষ্টান্ত আজগবি মসজিদ, যা ১৬০০-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে শাহ সুজার আমলে নির্মিত। এই মসজিদটি "চৌধুরী পাড়া মসজিদ" নামেও পরিচিত। কক্সবাজার পৌরসভার বিজিবি ক্যাম্পের উত্তর পাশে অবস্থিত এই মসজিদে পৌঁছানোর জন্য রিকশা বা টমটম সহজেই পাওয়া যায়।
রাখাইন সম্প্রদায়ের প্যাগোড়া
১৭৯০ সালে আরাকান বিজয়ের পর রাখাইন সম্প্রদায় কক্সবাজারে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিভিন্ন প্যাগোড়া নির্মাণ করেন। কক্সবাজার সদর, রামু এবং টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের অনেক প্যাগোড়া দেখা যায়, যেগুলো স্থানীয়ভাবে "জাদী" নামে পরিচিত।
অগগা মেধা বৌদ্ধ ক্যাং
কক্সবাজার সদরে অবস্থিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় স্থাপনা হলো অগগা মেধা বৌদ্ধ ক্যাং। এখানে ৭টিরও বেশি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে অগগা মেধা ও মাহাসিংদোগী ক্যাং সবচেয়ে বিশিষ্ট। বুদ্ধপূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা এবং বিষু উৎসবসহ প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো এখানে উদযাপিত হয়।
রামকোট তীর্থধাম
রামকোট তীর্থধাম, বনাশ্রমের পাশ্ববর্তী পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত, যা ৯০১ বাংলা সনে স্থাপিত। কথিত আছে, রাম-সীতা বনবাসকালে রামকোটে অবস্থান করেছিলেন। এই পবিত্র স্থানে একটি বৌদ্ধ বিহারও আছে যেখানে ধ্যানমগ্ন একটি বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি সম্রাট অশোকের সময়ের স্থাপত্যের নিদর্শন।
ছেংখাইব ক্যাং
রামুর শ্রীকুল এলাকার বাঁকখালী নদীর তীরে অবস্থিত ছেংখাইব ক্যাং বা বৌদ্ধ বিহার, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পিতল ও শ্বেতপাথরের বুদ্ধমূর্তি সংরক্ষিত আছে। রামু থানায় ২৩টি বিহারে শতাধিক বুদ্ধমূর্তি রয়েছে, যা ঐতিহ্যগতভাবে অমূল্য।
কানা রাজার সুড়ঙ্গ
উখিয়ার জালিয়া পালং ইউনিয়নে পাটুয়ার টেক সৈকতের কাছে অবস্থিত কানা রাজার সুড়ঙ্গ। কথিত আছে, এক সময় মগ সম্প্রদায়ের কানা রাজা এই সুড়ঙ্গটি নির্মাণ করেন আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে।
মাথিনের কূপ
মাথিনের কূপ কক্সবাজারের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা মাথিন নামের এক তরুণী ও পুলিশের দুঃখময় প্রেমের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে টেকনাফ থানার সামনে অবস্থিত এই কূপটি প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদের নিদর্শন হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।
মা অষ্টভূজা
মহেশখালী দ্বীপে আদিনাথ শিব মন্দিরের পাশে মা অষ্টভূজার একটি মূর্তি রয়েছে। মহেশখালীতে যেতে কস্তুরা ঘাট থেকে স্পিডবোট বা নৌকা ব্যবহার করা হয়। গোরকঘাটা জেটি থেকে রিকশায় আদিনাথ মন্দির ও মা অষ্টভূজার মূর্তির কাছে পৌঁছানো যায়।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক ডুলাহাজারা, যা ২,২২৪ একর আয়তনের পাহাড়ি এলাকায় বিস্তৃত। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো পশু-পাখির সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিমি উত্তরে অবস্থিত এ পার্কটি বিনোদনের জন্য একটি চমৎকার স্থান।
অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
কক্সবাজারে হিমছড়ি ঝর্না, ইনানী বিচ, সোনাদিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিন, ছেঁড়াদ্বীপ এবং মহেশখালী দ্বীপ ভ্রমণের জন্য উল্লেখযোগ্য স্থান।
ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
কক্সবাজার ভ্রমণের আগে আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং সাগরে গোসলের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। ভাটার সময়ে সাগরে নামা এড়িয়ে চলতে হবে এবং সিগন্যাল পতাকা অনুযায়ী সমুদ্রের সীমানা অনুসরণ করতে হবে।
১. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: কক্সবাজারের সৈকতটি মসৃণ বালুর দ্বারা
আচ্ছাদিত, যা এর অনন্য
বৈশিষ্ট্য। এখানে সমুদ্রের ঢেউ, সূর্যাস্ত এবং
শান্ত বাতাস আপনাকে এক অন্যরকম অনুভূতি
দেবে। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়
সৈকতের দৃশ্য অপরূপ।
২. পর্যটন আকর্ষণ:
- হিমছড়ি: কক্সবাজার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, হিমছড়ির জলপ্রপাত এবং পাহাড়ি দৃশ্য পর্যটকদের খুব আকৃষ্ট করে।
- ইনানী বিচ: এটি কক্সবাজারের প্রধান সৈকত থেকে একটু দূরে, যেখানে পাথুরে সৈকত এবং নীল সমুদ্রের রূপ অন্যরকম মনোমুগ্ধকর।
- মহেশখালী দ্বীপ: এটি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ, যেখানে মন্দির, বৌদ্ধবিহার এবং ঘন সবুজ বনানী রয়েছে।
- সেন্ট মার্টিন দ্বীপ: কক্সবাজার থেকে সহজেই নৌপথে যাওয়া যায়। প্রবাল দ্বীপ হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ প্রিয়।
৩. অ্যাডভেঞ্চার এবং ওয়াটার স্পোর্টস:
- কক্সবাজারে সার্ফিং, প্যারাসেইলিং, বোট রাইডিং এবং স্কুবা ডাইভিং-এর মতো অনেক ওয়াটার স্পোর্টসের সুবিধা রয়েছে। যারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ গন্তব্য।
৪. খাবার এবং সংস্কৃতি:
- কক্সবাজারে সি-ফুড বেশ জনপ্রিয়। এখানকার রেস্তোরাঁগুলোতে টাটকা মাছ, চিংড়ি, লবস্টার পাওয়া যায়। এছাড়াও, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের আতিথেয়তা আপনার ভ্রমণকে আরো উপভোগ্য করে তুলবে।
কীভাবে
যাবেন?
ঢাকা
থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বাস, ট্রেন
এবং বিমান পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট
কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামিয়ে দেয়। এছাড়া, চট্টগ্রাম
থেকেও সড়কপথে সহজেই কক্সবাজার যাওয়া যায়।
কোথায়থাকবেন?
কক্সবাজারে
বিভিন্ন ধরণের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। পাঁচ তারকা হোটেল
থেকে শুরু করে বাজেট-ফ্রেন্ডলি রিসোর্ট পর্যন্ত অনেক বিকল্প রয়েছে।
কিছু জনপ্রিয় হোটেল হলো:
- সি পার্ল বিচ রিসোর্ট
- হোটেল দ্য কক্স টুডে
- লং বিচ হোটেল
উপসংহার
কক্সবাজারের
সৌন্দর্য এবং আকর্ষণীয় স্থানগুলো
সবসময়ই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সমুদ্রের ঢেউ,
সাদা বালির সৈকত, সবুজ পাহাড় এবং
আকাশে রং ছড়ানো সূর্যাস্ত—সব মিলিয়ে কক্সবাজার
ভ্রমণ প্রতিটি ভ্রমণপ্রেমীর জন্য একটি অবিস্মরণীয়
অভিজ্ঞতা হতে বাধ্য।



0 Comments